শুক্রবার, ২৭শে মে, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

শিশু সুরক্ষার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের বিশেষ ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ: জয়দীপ মুখার্জী

News Sundarban.com :
এপ্রিল ২৪, ২০২২
news-image

মনোজ রায়, জলপাইগুড়ি:

শিশু সুরক্ষার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে দেখা যায় যে সুপ্রিম কোর্ট শিশু সুরক্ষার বিষয়ে সদা তৎপর। জলপাইগুড়িতে শিশু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উদ্যোগে আয়োজিত শিশু অধিকার সুরক্ষা সচেতনতা শিবির অনুষ্ঠানে এমনটাই জানান সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী তথা লিগ্যাল এইড ফোরামের সাধারণ সম্পাদক জয়দীপ মুখার্জী। তিনি বলেন, “বিভিন্ন রাজ্য সরকার দাবি করে যে মিড ডে মিল তারা চালু করেছে। কিন্ত সত্যিটা হল, মিড ডে মিলের নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থায় সুপ্রিম কোর্ট বিভিন্ন রাজ্য সরকারের মাধ্যমে সেই নির্দেশ গুলি বলবৎ করায়।’

 

তিনি আরও বলেন, “আমাদের দেশ তৃতীয় বিশ্বের দেশ। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে অনেক সমস্যা রয়েছে। আমাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধি একটা বড় সমস্যা। ফলে সরকারের তরফে বিভিন্ন জনকল্যাণমুখী প্রকল্প ঘোষণা করা হয় ঠিকই কিন্তু সেটা বিভিন্ন মানুষের মধ্যে বিকেন্দ্রীকরণে সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। অর্থাৎ তৃণমূল স্তরে সাধারণ মানুষ সেই প্রকল্পের সুবিধা পায় না। তাঁর কথায়, “আমরা তৃতীয় বিশ্বের দেশে বসবাস করি। বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখা যায় শিশু শ্রম বা শিশু নিগ্রহের ঘটনা ঘটছে। এটা ঠিক যে আমাদের দেশে শিশুদের অধিকার ১০০ শতাংশ ক্ষেত্রে সুরক্ষিত না হলেও ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে শিশু অধিকার সুরক্ষা করার চেষ্টা সরকার করেছে।”

জয়দীপ বাবু বলেন, “শিশু সুরক্ষার জন্য আমাদের দেশে অনেক কমিটি, কমিশন রয়েছে কিন্তু তবুও আমাদের দেশে শিশু শ্রম, শিশু পাচার, শিশুদের যৌণ নিগ্রহ এমন বহু ঘটনা ঘটে চলে। সংবাদ মাধ্যমের দৌলতে এই ঘটনা গুলো আমরা জনতে পারি। ফলে তার জন্য প্রতিবাদ হয়, মামলা হয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই এরকম ঘটনা সংবাদ মাধ্যমের আড়ালেই থেকে যায় যা আমরা জানতে পারি না। এক্ষেত্রে সেই নির্যাতিতরা প্রকৃত বিচার পায় না।

 

ইট ভাটা এই মুহুর্তে ভারতের দ্বিতীয় বড় ইন্ডাস্ট্রি। কয়েক কোটি মানুষ এখানে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। সেখানে দেখা যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাবা মায়ের সঙ্গে বাচ্চারাও কাজ করছে। শুধু তাই নয়, তাদের বয়স ১৮- র নীচে। এসব দেখেও আমরা নীরব থাকি। কারণ তাদের কাজে বাধা দিলে পরের দিন থেকে আর খেতে পারবে না। জয়দীপ বাবুর কথায়, “একটা সমীক্ষায় আমি দেখেছি ভারতবর্ষের একটা বড় অংশের বাচ্চাদের শুধু মাত্র দুবেলার খাবার জোট বিভিন্ন দোকানে কাজ করে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় সেই শিশুদের শ্রমের উপর তাদের পরিবারও নির্ভর করে।”

তিনি বলেন, “এগুলো সমস্যা থেকে সমাধান পাওয়ার আশায় বিভিন্ন প্রকল্প চালু হয়েছে আমাদের রাজ্যে। স্কুলে পড়াশোনার ব্যাবস্থা, মিড ডে মিল এগুলো করা হচ্ছে। যদিও এসবের মাধ্যমে খুব যে সাফল্য এসছে তা নয়, এটা সামগ্রিক সমস্যা, সারা ভারতবর্ষের এবং সারা বিশ্বের সমস্যা। বহু পাশ্চাত্য দেশেও যেমন আমেরিকা,ইংল্যান্ড, রাশিয়া প্রভৃতি দেশেও শিশু শ্রম সমস্যা রয়েছে। তবে সেটা অন্য ভাবে। কিন্ত আমাদের দেশে যেহেতু জনসংখ্যা অত্যন্ত বেশি, তাই আমরা দিন দিন ধরে এই সমস্যার মধ্যে জড়িয়ে পড়ছি।”

 

এই সমস্যা সমাধানের প্রসঙ্গে জয়দীপ বাবু বলেন, “আমাদের যে বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে তা হল, কাজের প্রলোভন দেখিয়ে কেউ যাতে কোনও বাচ্চাকে পাচারের উদ্দেশ্যে না নিয়ে যেতে পারে। সেরকম কিছু হলে প্রশাসনকে জানান। এছাড়াও বিভিন্ন সরকারী বেসরকারী ফোরাম রয়েছে সেখানে জানান। এসপি, ডিএম, জেলাপরিষদে জানান। এরকম অনেক ক্ষেত্রে পুলিশের সাফল্য দেখা যায়। আমরা দেখেছি মুম্বাই দিল্লি বা দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকে পুলিশ বিভিন্ন বাচ্চাকে উদ্ধার করেছে। এরকম ক্ষেত্রে বাড়ির লোকের উচিত প্রথমেই পুলিশ প্রশাসনকে জানানো বা বিভিন্ন এনজিও কে জানানো। একটা সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে ভারত থেকে বিভিন্ন বাচ্চা ছেলে মেয়েদের পাচার করা হচ্ছে ভারতের বাইরে এবং সেখানে তাদেরকে দিয়ে পরিচারক বা পরিচারিকার কাজ করানো হয়।”

 

জয়দীপ বাবু বলেন, “আমাদের রাজ্যে এবং পাশের রাজ্যে সরকার এবং আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে, এই ধরনের সমস্যা সংক্রান্ত কোনও কেস যদি আসে, তাহলে সেগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার জন্য। এক্ষেত্রে পুলিশ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রয়েছে। সে রাজ্য সরকারের হোক বা কেন্দ্র সরকারের। সকল কর্তৃপক্ষ চায় এক্ষেত্রে শিশুটিকে খুঁজে বের করে পরিবারে হাতে তুলে দিতে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সফলতা আছে আবার অসফল ঘটনাও দেখা যায়। প্রতিটি সাব ডিভিশন এবং জেলা আদালতেই এখন লিগ্যাল এইড সার্ভিস আছে যারা বছরে ৬৫ হাজার টাকার নিচে আয় করা ব্যাক্তিদের বিনা পয়সায় আইনি সহায়তা দেয়।” তবে অভিযুক্ত ব্যাক্তিরও আইনি অধিকার পাওয়ার সম্পূর্ণ অধিকার রয়েছে বলেও জানান তিনি

তিনি আরও বলেন, আমাদের রাজ্য সরকার চা বাগান এলাকাগুলোতে বিভিন্ন প্রকল্প করেছেন। সেই প্রকল্পগুলোর সুবিধা যাতে তৃনমূল স্তরের শ্রমিকেরা পান, সেদিকে আমাদের নজর রাখা দায়িত্ব। তাহলেই আমরা জয় লাভ করবো এই সমস্যা থেকে। শুধু সরকারের সমালোচনা না করে এগুলো দেখা আমাদের সকলের কর্তব্য।”