বুধবার, ৬ই জুলাই, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

বেড়িয়ে আসি মধুপুরধাম

News Sundarban.com :
সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৯
news-image

বিবেকানন্দ বসাক

তখনও শ্রীচৈতন্যদেব বাংলাদেশে আবির্ভূত হননি। কিন্তু ততদিনে অসমিয়া সমাজের কোল আলো করে এক মহাশক্তিধর ব্যক্তিত্ব, মহাপুরুষ তথা সাধক আবির্ভূত হলেন তিনি আর কেউ নন, শ্রীমন্ত শঙ্করদেব। মধ্য অসমের নগাঁও শহর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে বরদোয়ায় ১৪৪৯ সালে তাঁর আবির্ভাব ঘটে। পরে অসমের বরদোয়া বা বটদ্রবা তীর্থক্ষেত্রে রূপ নেয়। এমনকী, উজান অসমের যোরহাট পেরিয়ে গেলেই এশিয়ার বৃহত্তম নদীদ্বীপ মাজুলি চোখে পড়বে।ব্রহ্মপুত্র নদকে কেন্দ্র করে মাজুলির বিস্তার দেখে মন জুড়িয়ে যায়।

সেখানেও শঙ্করদেবের সত্র রয়েছে। গোটা অসমে ছড়িয়ে আছে এমন বহু সত্র অর্থাৎ বাংলায় যাকে বলে ধাম বা মন্দির। রেলে অসমের হাওরাঙ্গাযাওয়ে কর্মরত আমার সহপাঠী দীপঙ্কর দেবনাথ আচমকা কাকভোরে আমাদের বাড়িতে এসে হাজির। বলল, চল বেড়িয়ে আসি। আমি বললাম, কোথায় যাবি? দীপঙ্করের সাফ জবাব, কোনও কৈফিয়ত দিতে পারব না। বাইকে বসে পড়। যেদিকে মন চায় সেইদিকে চলতে শুরু করব। কী আর করা যায়? কথা না বাড়িয়ে, চলতে শুরু করলাম। আলিপুরদুয়ার থেকে আমাদের গন্তব্য মধুপুরধাম। একে মধুপুরসত্র বা দশমুকুতর থানও বলা হয়।

মধুপুরের আগের নাম ছিল চন্দনচৌরা। কোচবিহার শহর থেকে মধুপুরধামের দূরত্ব ১২ কিলোমিটার। আলিপুরদুয়ার থেকে ৩২ কিলোমিটার। কোচবিহার শহর থেকে মধুপুরধামে যাওয়ার গাড়ি পাওয়া যায়। কোনও সমস্যা নেই। জানা গিয়েছে, শ্রীমন্ত শঙ্করদেবের যখন বয়স ৯৭ বছর, ঠিক সেই সময় তিনি প্রধান শিষ্য মাধবদেব, নারায়ণ ঠাকুর, রামরাম গুরু ও রামরায় সহ শতাধিক ভক্তকে নিয়ে দ্বিতীয়বার পুরীর উদ্দেশে রওনা হন। ফেরার পথে আনুমানিক ১৫৫০ খ্রিস্টাব্দে একটি বড় বটগাছের তলায় ভক্তদের ভাগবত থেকে বৃন্দাবনের শ্রীকৃষ্ণের লীলার কথা ব্যাখ্যা করেছিলেন। এমন সময় একজন গুরু গাছ থেকে মৌচাক পেরে সবাইকে তৃপ্ত সহকারে খাওয়ান। এই ঘটনাটি মনে রাখতেই শঙ্করদেব জায়গাটির নাম দেন মধুপুর থান। ষোড়শ শতকে কোচবিহারের রাজা নরনারায়ণ এই সত্র নির্মাণ করেন। রাস্তায় জলখাবার সেরে নিয়ে সকালের স্নিগ্ধতায় কয়েক ঘণ্টা আমি এবং দীপঙ্কর কাটিয়ে দিলাম।

প্রধান গুরুর সমাধি মন্দির, কীর্তন ঘর, মণিকূট, সমাধি মন্দিরে গুরুর বসার খাট, খড়ম, রাজার দেওয়া লাঠি, জপমালা, সাঁচিপাতার গুণমালা পুঁথি সহ অনেক কিছু দুচোখ ভরে চেখে নিলাম। এমন শান্ত, সমাহিত স্থান ছাড়া প্রকৃত সাধন ভজন হয় না। ভারতবর্ষ যে আধ্যাত্মিকতার পীঠস্থান, তা উপলব্ধি করতে গেলে এমন স্থানেই দিনের পর দিন কাটানো জরুরি, এমনটা বলাই যায়।