সোমবার, ২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

ছোটমোল্লাখালি দ্বীপে সাতভাইয়ের পরিবারে বোন চম্পা রুপে পুজিত হয় দেবী দশভূজা

News Sundarban.com :
সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২২
news-image

দুঃখ কষ্টের মাঝেও সুন্দরবনের দ্বীপান্তরের সাধারণ মানুষ ভোলেনি পরমান্য পরিবারে চম্পা রুপে দেবী দশভূজার আগমনের কথা। শরতের শিশির বিন্দু গায়ে মাখিয়ে শিউলির পূর্বাভাস পেয়েই দোদুল্যমান কাশ ফুলের আবেগ নিয়ে সমস্ত দুঃখ যন্ত্রণা,বেদনা ভুলে দূর্গা মায়ের আরাধনায় ব্রতী হয়েছেন সুন্দরবনের প্রত্যন্ত ছোট মোল্লাখালি দ্বীপের পরমান্য পরিবার।

নিজস্ব সংবাদদাতা, ক্যানিং :  বাংলাদেশের খুলনা জেলার বাদোঘাটা থানার অন্তর্গত বাদোঘাটা গ্রামের পরমান্য জমিদার পরিবার।পরিবারের কর্তা উমেশ চন্দ্র পরমান্য।জমিদার পরিবারের উমেশচন্দ্রের সাত পুত্র সন্তান। সাত পুত্র রাজেন্দ্র,দেবেন্দ্র,কালীপদ, নটোবর,দ্বিজেন্দ্র,অতিকায় ও বিপিন বিহারী পরমান্যদের নিয়েই সুখেই কাটছিল জমিদার পরমান্য পরিবারের।পরিবারে কোন কন্যা ছিলো না।ফলে যে পরিবারে সাত সাতজন ভাই রয়েছেন। সেখানে কোন বোন নেই তা হতে দেওয়া যায় না।এমন ঘটনায় পরমান্য পরিবারের সদস্যরা মহাসংঙ্কটে পড়ে যায়। চলে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। অবশেষে সংঙ্কট থেকে মুক্তির জন্য পরিবারিক গুরুদেবের দ্বারস্থ হয় পরমান্য পরিবার। বিপদ মুক্ত হতে গেলে পরিবারের মধ্যে মাতৃ আরাধনার আয়োজন করতে হবে। তবেই পরমান্য পরিবার সংঙ্কটময় বিপদ থেকে উদ্ধার হবে। শুরু হয় পারিবারিক গুঞ্জন। স্থীর হয় সাতভাইয়ের একমাত্র বোন স্বরুপ দেবী দশভূজা কে চম্পা রুপে পরিবারের মধ্যে বরণ করে নেওয়া হবে।

পরিবারের গুরুদেব বিজয় কৃষ্ণ গোস্বামীর নির্দেশ পালন করে ১৯০৯ সালে জমিদার উমেশ চন্দ্র পরমান্য পারিবারিক দুর্গোৎসব শুরু করেন।  কুলপুরোহিত সুরেন ভট্টাচার্য ও বিষ্টুপদ ঘোষাল এর তত্বাবোধানে শুরু হয় শাস্ত্রীয়মতে দেবী আরাধনা।দেবী দশভূজা কে চম্পা রুপে শুরু হয় পূজো।শাস্ত্রীয় মতে পুজোর পর বিসর্জন হয়ে গেলেও প্রতিমার প্রতিষ্ঠিত দেবীঘট কে প্রতিদিন পুজো করে থাকে পরমান্য পরিবারের সদস্যরা।

প্রত্যন্ত সুন্দরবনের নদীনালা বেষ্টিত জল জঙ্গল ঘেরা ছোট্ট একটি দ্বীপ ছোটমোল্লাখালি।সাতজেলিয়া,দত্তা,গাঁড়াল ও বিদ্যাধরী নদী দিয়ে ঘেরা ছোট মোল্লাখালি দ্বীপের জঙ্গল পরিষ্কার করে মানুষের বসবাস শুরু হয়েছিল কয়েক যুগ আগে।দেশ স্বাধীনের পর ১৯৪৭ সালে পরমান্য পরিবার ভারতে চলে আসেন।ছোটমোল্লাখালি দ্বীপ এলাকার একমাত্র হেতালবেড়িয়া গ্রাম।সেই গ্রামের জমিদার অহিদারি ঘোষ। তাঁর জমিতে বসবাস শুরু করেন পরমান্য পরিবার।রয়্যাল বেঙ্গলের ডেরা সংলগ্ন প্রত্যন্ত এই দ্বীপে ১৯৪৭ সালে আবারও শুরু হয় পারিবারিক দুর্গোৎসব।

জানা যায় তৎকালীন সময়ে মাতৃরুপে চিন্ময়ীচম্পা কে রুপদান করেছিলেন মৃৎশিল্পী সুরেন ঘরামী। কালের প্রবাহে অতীতের সেই নিয়ম নিষ্ঠার সাথে পরমান্য পরিবারে আজও সাত ভাইয়ের একমাত্র বোন চম্পা রুপে পুজিত হয় দেবী দশভূজা। এই পরিবারের দুর্গাপ্রতিমা তৈরী হয় ডাকের সাজ বিহীন সম্পূর্ণ মাটি দিয়েই রাজ রাজেশ্বরী মূর্তি। যা এক বিশেষ বৈশিষ্ট।আর্থিক অনটনের জন্য আচমকাই পারিবারিক এই পুজো বন্ধ হয়ে যায় ১৯৮১ সালে।পরে সংঙ্কটমোচন হলে প্রিয়াংশু,পবিত্র,প্রদীপ্ত,পুলকেশ পরমান্যদের উদ্যোগে আবারও পারিবারিক দুর্গোৎসব শুরু হয় ২০১৬ সালে। বিগত দিনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ আয়লা, আম্ফান,ফণী, বুলবুল, ইয়াস ঘূর্ণিঝড় সহ প্রবল জলোচ্ছ্বাসে তছনছ করে দিয়েছে সমগ্র সুন্দরবন। দুঃখ কষ্টের মাঝেও সুন্দরবনের দ্বীপান্তরের সাধারণ মানুষ ভোলেনি পরমান্য পরিবারে চম্পা রুপে দেবী দশভূজার আগমনের কথা।শরতের শিশির বিন্দু গায়ে মাখিয়ে শিউলির পূর্বাভাস পেয়েই দোদুল্যমান কাশ ফুলের আবেগ নিয়ে সমস্ত দুঃখ যন্ত্রণা,বেদনা ভুলে দূর্গা মায়ের আরাধনায় ব্রতী হয়েছেন সুন্দরবনের প্রত্যন্ত ছোট মোল্লাখালি দ্বীপের পরমান্য পরিবার।শহর থেকে এই গ্রামের দূরত্ব প্রায় ২০০ কিলোমিটারেরও বেশি।কিছুটা এগিয়ে গেলেই সুন্দরবনের রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের আস্তানা। সুন্দরবনের অসহায় দরিদ্র পরিবারের মানুষরা এই পরামান্য পরিবারের পূজোকে নিজেদের পুজো মনে করেই পুজোর দিনগুলো আনন্দে কাটিয়ে দেয়। পরামান্য পরিবারের অন্যতম সদস্য পুলকেশ পরামান্য জানান ‘তাঁর ঠাকুরদা উমেশচন্দ্র এই পুজোর সূচনা করেছিলেন বিগত প্রায় ১১৩ বছর আগে বাংলাদেশে। তবে এই পুজোকে ঘিরে গ্রামের মানুষের মনে খুশি হাওয়া লেগেছে। শহরের লাখ টাকা বাজেটের পুজোর কাছে এই পুজো অতি সাধারণ। না আছে প্যান্ডেলের বাহার,না রয়েছে কোন থিমের ছোঁয়া। দুচালা তাবুর প্যান্ডেলে এবার মাকে দেখতে ভীড় জমাবে প্রত্যন্ত সুন্দরবনের বিভিন্ন দ্বীপের অসহায় সম্বলহীন পরিবারের কচিকাঁচা থেকে বৃদ্ধ-বৃদ্ধরা।’

পরমান্য পরিবারের কুলবধু প্রতিভা দেবী জানিয়েছেন ‘করোনা তন্ডবে এলাকার অর্থনৈতিক পরিকাঠামো প্রায় ভেঙে পড়েছিলো।তাছাড়াও প্রাকৃতিক দুর্যোগতো রয়েছে।এতসবের মধ্যে পারিকবারি পুজোয় পরিবারের মধ্যে আনন্দ যাতে সীমাবদ্ধ না থাকে,তারজন্য পুজোর বাজেট কাটছাঁট করা হয়েছে।এলাকার প্রায় শতাধিক দরিদ্র মানুষের জন্য নতুনবস্ত্র প্রদান করা হবে দেবীপক্ষের শুরু মহালয়াতেই।যাতে করে তাঁরা নতুন বস্ত্র পরিধান করে পরমান্য পরিবারের পারিবারিক পুজোয় আরো বেশি করে আনন্দ উপভোগ করতে পারেন।’

দশমীর নির্দিষ্ট দিনক্ষণেই দেবী দশভূজাকে সুন্দরবনের নদীতে বিসর্জন দেওয়া হয়। বিসর্জনের পর একটি বছরের জন্য প্রতীক্ষায় চাতকের মতো তাকিয়ে থাকেন পরমান্য পরিবার সহ ছোট মোল্লাখালির হেতালবেড়িয়া গ্রামের প্রায় পাঁচশো পরিবার দুহাজারেরও বেশী মানুষজন।