বৃহস্পতিবার, ৯ই ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

ইচ্ছেঘুড়ির ডোর

News Sundarban.com :
অক্টোবর ১৮, ২০২১
news-image

ইচ্ছেঘুড়ির ডোর

মহিবুল আলম

।। এক ।।

বাসার পেছনের উঠোনে শীতের সন্ধ্যার অন্ধকারটা এরই মধ্যে জমাট বাঁধতে শুরু করেছে।উঠোন ঘেঁষে একটা বড় কমলা গাছ। পাশেই একটা ফিজিওয়া গাছ। সেখান থেকে অনবরত ঝিঁ ঝিঁ পোকা ডাকছে,ঝিঁ-ই-ই-ঝিঁরিৎ, ঝিরিৎ,ঝিঁ-ই-ই-ঝিরিৎ, ঝিরিৎ।

বাইরে শীত পড়েছে বেশ। স্থানে স্থানে ধোঁয়া ওঠার মতো কুয়াশা উড়ছে। নিউজিল্যান্ডের শীতকাল জাহিদের ভালো লাগে না। অথচ এই শীতকালেই তাদেরকে কিউই ফলের অরচার্ডের সবচেয়ে কঠিন কাজটাকরতে হয়। খুব সকালে উঠেঘাসের উপর বিছিয়ে থাকা বরফের স্তর মচ মচ করে ভেঙে সবাই কিউই ফলের গাছের প্রুনিং করে।

শীতকালের কিউই ফল গাছের এই প্রুনিংকে বলা হয় উইন্টার প্রুনিং।

জাহিদ আবার বাইরে তাকাল। বাসার ভেতরের আলো জানালা গলে বাইরে গিয়ে পড়েছে। তার বাসায় দুটোই জানালা। একটা লাউঞ্জে, অন্যটা বেডরুমে।

জাহিদদের বাসাটা ঠিক পুরোপুরি সয়ংসম্পূর্ণ বাসা বলা যায় না। এটা বাসার পেছনে একটা স্লিপ আউট। অনেকে যেটাকে গ্র্যানি ফ্ল্যাট বলে। মূলত এটা বাড়ির পেছনে বাড়ি। যাদের বড় পরিবার, তারা ওটাকে শখের ফ্ল্যাট হিসেবে ব্যবহার করে। আর যাদের পরিবার ছোট, তারা ওটাকে ভাড়া দিয়ে বাড়তি কিছু পয়সা ব্যাংকে জমা করে।

জাহিদ ও আজমল হোসেন এই স্লিপ আউটটা হাদী হোসেনের কাছ থেকে ভাড়া নিয়েছে। হাদী হোসেনের চার বেডরুমের বাসার পেছনের উঠোনে করোগেটেড আয়রন ও ওয়েদার বোর্ডের তৈরি এই স্লিপ আউটটা। একটা বেডরুম। বেডরুম লাগোয়া বাথরুম। ছোট্ট একটা লাউঞ্জ। লাউঞ্জের একপাশে কিচেন। বাইরে যাওয়ার একটাই মাত্র দরজা।এমনিতে বাসাটায় বসবাসের কোনো সমস্যা হয় না। শুধু একটাই সমস্যা, আজমল হোসেন খুব নাক ডাকেন। এত জোরে জোরে নাক ডাকেন যে একই রুমে তাঁর পাশের বেডে ঘুমানো দায় হয়ে যায়। এদিকে রাতে ঘুম না হলে ভোরে উঠে কিউই ফলের বাগানেপায়ের নিচে বরফের স্তর কড়মড় করে ভেঙে উইন্টার প্রুনিং করা খুবই দুরূহ ব্যাপার। তাই সে লাউঞ্জের লম্বা সোফাটাতে ঘুমায়।

জাহিদ জমে থাকা অন্ধকার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে এবার হাদী হোসেনের বাসার দিকে তাকাল। হাদী হোসেন মানুষটা ভালোই। একটু চুপচাপ ধরনের। তবে টাকাপয়সার ব্যাপারে ষোল আনার বোঝেন। ওরা যে কিউই ফলের বাগানে কাজ করে, সেখান থেকে তিনি কমিশন পাই পাই হিসেব করে নেন।বয়স বেশি নয়, চল্লিশের মতো। নিউজিল্যান্ডে আছেন প্রায় চৌদ্দ বছর ধরে। বে-অব-প্লেন্টির তাওরাঙ্গা-টিপুকি অঞ্চলে তিনি আরও দশজনকনট্রাক্টরদের মতো একজন কন্ট্রাক্টর। এরই মধ্যে বেশ প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। তাওরাঙ্গা শহরের এই বাড়িটা বাদেও আরও দুটো বাড়ি আছে। ঢাকা রামপুরার অদূরে একটা প্লট কিনে আট তলা বাড়ি বানিয়েছেন।

জাহিদ ও আজমল হোসেন হাদী হোসেনের অধীনেই কাজ করে।তাওরাঙ্গা-টিপুকি শহরেরকন্ট্রাক্টরদের কাজ,ওরা অরচার্ডের মালিকের কাছ থেকে কিউই ফলের বড় বড় বাগান নিয়েই কমিশনে শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করায়।

আজমল হোসেন কখন পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, জাহিদ তা খেয়াল করেনি। সে খানিকটা চমকে উঠে জিজ্ঞেস করল, আজমল ভাই, আপনি, ঘুমাননি?

আজমল হোসেন বললেন, না, বইটা পড়ছিলাম।

– কোন বইটা, শেক্সপিয়ারের বাংলা অনুবাদ?

– আছে তো একটা বই। আর কোনটা পড়ব?

– তাওরাঙ্গা সেন্ট্রাল লাইব্রেরি থেকে ইংরেজি বই এনেও তো পড়তে পারেন?

– এমনিতে ইংরেজি পত্রিকা পড়তে খারাপ লাগে না। কিন্তু সাহিত্যের বই ইংরেজিতে পড়তে তেমন আনন্দ পাই না। অনুবাদ করা থাকলে আনন্দ পাই। আর শেক্সপিয়ায়ের বাংলা অনুবাদ সমগ্রটা কত বড়! যতবার পড়ি ততবারই মনে হয় নতুন করে পড়ছি।

জাহিদ মৃদু হেসে বলল, তাই, ভালো।

।। দুই ।।

আজ সারাদিন খুব পরিশ্রম গেছে। কিউই ফলের বাগানটা ঠিক যেন বাগান ছিল না। জঙ্গল ছিল। টিপুকির কাছে মাকিতুতে তাদের কাজ হয়েছিল। সাধারণত উইন্টার প্রুনিংয়ে একেকটা কিউই ফল গাছের দশ-এগারোটা নতুন ডালা ও দুই-তিনটা পুরোনো ডালা রেখে বাকি সব ডালা কেটে ফেলে দিতে হয়। কিন্তু মাকিতুর কিউই ফলের বাগানে যেন নতুন ডালা খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল, সব ডালা প্যাচিয়ে শুধু জঙ্গল নয়, দুর্বোধ্য জঞ্জালে পরিণত হয়েছে।

জাহিদকে তারপরও সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে রান্না করতে হয়েছে। আজমল হোসেন অবশ্য তাকে আগাগোড়া রান্নায় সহযোগিতা করেছেন। রাত আটটার মধ্যে খেয়েদেয়ে আজমল হোসেন বেডরুমে চলে যান। জাহিদ লেপ মুড়ি দিয়ে লাউঞ্জের দিঘল সোফাটায় গা এলিয়ে টিভি দেখতে বসে।

টিভি দেখতে দেখতে জাহিদ এক সময় সোফায় ঘুমিয়ে পড়ে। তাওরাঙ্গা আসার পর সে রাতে এমনটাই করছে। রাতের খাবার খেয়ে লাউঞ্জের বড় সোফাটায় লেপ মুড়ি দিয়ে টিভি দেখে। এক সময় টিভি দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়ে। এমনও হয়, সে সকালে ঘুম থেকে উঠে টিভি বন্ধ করে।

আজও জাহিদ টিভি দেখতে দেখতে লাউঞ্জের সোফাতে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুমের মধ্যে সে একটা স্বপ্নও দেখছিল। কিন্তু সে কী স্বপ্ন দেখছিলতা ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গেই মনে করতে পারল না। ঘুম ভাঙার পর প্রথমে সে শুনল টিভির শব্দ।তারপর শুনল আজমল হোসেনের নাক ডাকার শব্দ। এর পরপরই সে স্লিপ আউটের দরজায় কাউকে কড়া নাড়তে শুনল।

জাহিদ ঘড়ি দেখতে দেখতে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। রাত এগারোটা বাজে। লাউঞ্জের লাইটটা তখনো জ্বালানো।

জাহিদ জিজ্ঞেস করল, কে?

– আমি, দরজা খোল।

– আমি কে?

– আমি হাদী।

জাহিদ দরজা খুলল। কিন্তু সে দরজা খুলেই হাদী হোসেনের চেহারার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল। হাদী হোসেনের চেহারা একেবারেই বিধ্বস্ত। মনে হচ্ছে, এইমাত্র তিনি কোনো ব্যাপারে কান্নাকাটি করে এসেছেন। চোখ তখনো ভেজা। গালের উপর চোখের জলের সরু রেখা।

জাহিদ জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে হাদী ভাই, এত রাতে?

হাদী হোসেন কান্না জড়ানো গলায় বললেন, আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে।

– কী সর্বনাশ?

– তোমার ভাবি জেদ ধরে অনেকগুলো প্রেশারের ওষুধ খেয়ে ফেলেছে।

– অনেকগুলো মানে?

– অনেকগুলো মানে ত্রিশ-চল্লিশটা। আরও বেশি হতে পারে।

– এটা কীভাবে হলো?

– তুমি তো জানোই, তোমার ভাবির প্রেশারের হাই। সবসময় প্রেশারের ওষুধ খায়। আজ জেদ ধরে বাসায় যতগুলো প্রেশারের ওষুধ আছে সব খেয়ে ফেলেছে।

– বলেন কী!

– হ্যাঁ, জাহিদ। আমি কী করব বুঝতে পারছি না।

– অ্যাম্বুলেন্স কল করেছেন?

– না, ঘটনাটা এইমাত্রই ঘটেছে। আমি দিশা না পেয়ে তোমার এখানে চলে এসেছি।

জাহিদ তার স্লিপিং গাউনটা চাপিয়ে বলল, চলুন, আগে ভাবির কী অবস্থা দেখি। তারপর না হয় অ্যাম্বুলেন্স কল করব।

হাদী হোসেন বললেন, তাই কর। আমার মাথায় কিছু ঢুকছে না।

হাদী হোসেনের বাসায় ঢুকে জাহিদ দেখল, ঘটনাটা এইমাত্র ঘটলেও লাকি ভাবির অবস্থা খুবই খারাপ। লাকি ভাবির মুখ দিয়ে অনবরত দিয়ে সরু ফেনা বের হচ্ছে। তিনি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন। তার শরীর থরথর করে কাঁপছে। হাদী হোসেন ও লাকি ভাবির বারো বছরের ছেলে সজল চুপচাপ মার পাশে বসে আছে।

হাদী হোসেন লাকি ভাবির পাশে হাঁটু গেড়ে বসে কেঁদে উঠে বললেন, আমি এখন এই পাগলটাকে নিয়ে কী করব?

লাকি ভাবি বিড় বিড় করে বললেন, হাদী, আমাকে বাঁচাও।

জাহিদ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কয়েক মুহূর্ত সে কিছু বলতে পারল না। একটা দেয়াল ঘড়ি চলছে- টিক টিক, টিক টিক। বাইরে রাতের শব্দ। শীত কুয়াশার জল পড়ছে- টুপ টুপ, টুপ টুপ।

লাকি ভাবি আবার বিড় বিড় করে বললেন, ওগো, শুনছ, আমি মরে যাচ্ছি…!

হাদী হোসেন এবার বাচ্চা ছেলের মতো ভেউ ভেউ করে কেঁদে উঠলেন।

জাহিদ বলল, ভাবি, আপনার কিছু হবে না। আপনি ভালো হয়ে যাবেন। আমি অ্যাম্বুলেন্স কল করছি। আপনি একটু ধৈর্য ধরেন। ঘাবড়াবেন না।- বলেই সে হাদী হোসেনের দিকে তাকিয়ে বলল, হাদী ভাই, আপনি একটা তোয়ালে ভিজিয়ে ভাবির মুখটা মুছে দিন। আমি এখনই একটা অ্যাম্বুলেন্স কল করছি।

হাদী হোসেন ওঠার আগেই সজল বলল, আমি তোয়ালে নিয়ে আসছি।

জাহিদ তৎক্ষণাৎ ট্রিপল ওয়ান-এ ফোন করে অ্যাম্বুলেন্স ডাকায় ব্যস্ত হয়ে উঠল।

।। তিন ।।

অ্যাম্বুলেন্স এল ঠিক আধাঘণ্টা পর। হাদী হোসেন স্টেচারের অপেক্ষা না করেই লাকি ভাবিকে পাঁজা কোলে করে অ্যাম্বুলেন্সের কাছে নিয়ে এল। সজল পেছনে পেছনে এল।

লাকি ভাবিকে অ্যাম্বুলেন্সে তুলতেই জাহিদ হাদী হোসেনকে বলল, হাদী ভাই, আপনি আর সজল অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে হাসপাতালে চলে যান। আমি গাড়ি নিয়ে আসছি।

হাদী হোসেন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে সায় দিলেন।

অ্যাম্বুলেন্স সাঁই সাঁই করে চলে গেল।

জাহিদ তার স্লিপ আউটে ঢুকেই দেখল, আজমল হোসেন ঘুম থেকে উঠে সোফায় বসে দরজার দিকে তাকিয়ে আছেন। টিভিটা তখনো চলছে।

জাহিদ জিজ্ঞেস করল, আজমল ভাই, আপনি ঘুম থেকে উঠে গেছেন যে?

আজমল হোসেন বললেন, হ্যাঁ, এখানে কে যেন এসেছিল। কথাবার্তা শুনলাম। তখনই আমার ঘুম ভেঙে গেছে। লাউঞ্জে এসে দেখলাম তুমি নেই।

– হাদী ভাই এসেছিলেন।

– হাদী এসেছিল, কেন?

– লাকি ভাবি জেদ ধরে প্রেশারের অনেকগুলো ওষুধ খেয়ে ফেলেছেন।

– বলো কী! এখন কী অবস্থা?

– অ্যাম্বুলেন্স কল করে দিয়েছি।হাদী ভাই লাকি ভাবিকে নিয়ে তাওরাঙ্গা হাসপাতালে গেছেন। সজলও গেছে। আমি এখন যাব। আপনি যাবেন?

– হ্যাঁ হ্যাঁ, আমিও যাব।

– তাহলে কাপড়চোপড় পরে তাড়াতাড়ি তৈরি হন। গরম কাপড় বেশি করে পরবেন। বাইরে অনেক শীত পড়েছে।

জাহিদ ও আজমল হোসেন স্লিপ আউট থেকে ত্বরিত প্যান্ট-শার্ট পরে, তার উপর ভারী সুয়াটার ও একটা ভারী জ্যাকেট চাপিয়ে, গলায় একটা মাফলার প্যাচিয়ে তাওরাঙ্গা হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। রাত তখন প্রায় বারোটা বাজে। শীতের রাত। রাস্তা-ঘাট প্রায় ফাঁকা। তাওরাঙ্গা শহরটা সমুদ্রের একেবারেপাশে বলেঅত কুয়াশা পড়ে না। কিন্তু আজ বেশ কুয়াশা পড়েছে। রাস্তার প্রতিটা বাতির সামনে কুয়াশার স্তরটা স্তব্ধ হয়ে জমে আছে। বাইরের তাপমাত্রা এখন নিশ্চয়ই হিমাংকের নিচে।

জাহিদ স্টেট হাইওয়ে টু ধরে যাচ্ছে। সেখান থেকে এলিজাবেথ স্টিটে মোড় নিয়ে দিঘল ক্যামেরুন রোড ধরে তাওরাঙ্গা হাসপাতালে যাবে।

রাস্তায় দুই-একটা গাড়ি আসা-যাওয়া করছে। দুই-একটা পুলিশের গাড়ি ধীরে-স্থিরে টহল দিচ্ছে। দুই-একটা সিকিউরিটি অফিসারের গাড়ি। মধ্যরাতের একটা প্লেন যাচ্ছে উপরের কুয়াশা ভেদ করে। তাওরাঙ্গা পোর্টে বড় একটা জাহাজ ভিড়েছে।

জাহিদ গাড়ি চালাতে চালাতে গ্লাস গলে বাইরে তাকাল। তাওরাঙ্গা পোর্টের সারি সারি থেমে থাকা স্পিডবোটগুলো থেকে সারি সারি আলোর রেখা আসছে। সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্পিডবোটগুলোর আলোর রেখা ওঠানামা করছে। স্পিডবোটগুলোতে কোনো মানুষজন নেই। বহুতল বিশিষ্ট ক্রুজশিপটার ছোট ছোট জানালা ভেদ করে ভেতরের আলো ছড়িয়ে পড়েছে বিন্দু বিন্দু হয়ে। জলের প্রতিবিম্বে আলোগুলো কেমন এলোমেলো হয়ে উঠছে। যেন জীবনের আলোগুলোর মতোই এলোমেলো।

।। চার ।।

জাহিদ ভাবল, জীবনের আলোগুলো সত্যি এলোমেলো ও বিচ্ছিন্ন। অ্যাম্বুলেন্স আসার আগে হাদী হোসেনের সঙ্গে কথা বলে সে যতটুকু বুঝেছে, ব্যাপারটা অতি সাধারণছিল।হাদী হোসেন ও লাকি ভাবির মধ্যে বাংলাদেশের তাদের সয়-সম্পত্তি নিয়ে কী সব কথা কাটাকাটি হয়েছিল। লাকি ভাবি খুব জেদী। এছাড়া তিনি উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন।এই বয়সেই তাকে নিয়মিত প্রেশারের ওষুধ খেতে হয়। তাই কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে লাকি ভাবি হাতের কাছে পাওয়া প্রেশারের ওষুধগুলো একত্রে মুখে দিয়ে চাবিয়ে খেয়ে ফেলেন। হয়তো তিনি কাজটা জেদের বশে করেছেন।কিন্তু প্রেশারের ওষুধগুলো খাওয়ার পর তার টনক নড়ে। মনের ভেতর ভয় ঢুকে যায়। তার মধ্যেমৃত্যু চিন্তা এসে ভিড় করে।

অথচ তাদের দুজনের প্রেমের বিয়ে। বাংলাদেশে থাকতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন বিষয় নিয়ে মাস্টার্স করে হাদী হোসেন একটা ওষুধ কোম্পানিতে বেশ ভালো বেতনেরই চাকুরি পান। চাকুরি পাওয়ার পরপরই লাকি ভাবিকে বিয়ে করেন। যদিও তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল, কিন্তু ওরা দুজন দূর সম্পর্কের খালাত ভাই-বোন হওয়াতে ওদের পারিবারিকভাবেই জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ে হয়। বিয়ের দুই বছরের মাথায় ওরা অভিবাসী হয়ে নিউজিল্যান্ডে চলে আসেন। তাদের ছেলে সজলের জন্ম হয় নিউজিল্যান্ডে।

হাদী হোসেন ও লাকি ভাবির সংসারটা বলা যায় অনেকটা নির্ঝঞ্ঝাটই। ষোল বছরের বিবাহিত জীবনে তাদের সম্পর্কের খুব একটা উত্থান-পতন হয়নি। নিয়মমাফিক স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে একটু-আধটুকু ঝগড়াঝাঁটি হতেই পারে। জাহিদ তাদের বাসার পেছনের স্লিপ আউটে বসবাস করতে এসে এর বেশি কিছু দেখেনি। কিন্তু আজ…?

।। পাঁচ ।।

হাসপাতালে পৌঁছে ইমার্জেন্সিতে ঢুকতেই জাহিদ ও আজমল স্যার দেখল, এরই মধ্যে লাকি ভাবিকে আইসিইউতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সজল আইসিইউর ভেতরে। কিন্তু হাদী হোসেন আইসিইউর সামনের ছোট্ট লাউঞ্জের একটা চেয়ারে অবলম্বনহীন বসে আছেন।

জাহিদকে দেখা মাত্রই হাদী হোসেন ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন।

জাহিদ হাদী হোসেনের পাশের চেয়ারে বসে জিজ্ঞেস করল, এখন ভাবির কী অবস্থা?

হাদী হোসেন শিশুর মতো কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, তোমার ভাবির শরীরের টেম্পারেচার খুব তাড়াতাড়ি কমে যাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে ব্লাড প্রেশার ত্বরিত নেমে যাচ্ছে।

– আপনি বাইরে বসে আছেন যে?

– আমার ভেতরের পরিবেশটা সহ্য হচ্ছিল না।

– ভাবি কথা বলতে পারছেন তো?

– হ্যাঁ, এখনো কথা বলছে।

– আপনি ভেতরে ঢোকেন। আপনাকে এখন ভাবির পাশে থাকতে হবে। অন্তত ভাবিকে মানসিকভাবে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য।

হাদী হোসেন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, জাহিদ তুমিও আমার সঙ্গে ভেতরে চল। আমারও মানসিকভাবে সাপোর্টের প্রয়োজন।

জাহিদ জিজ্ঞেস করল, একসঙ্গে এত মানুষ আইসিইউতে ঢুকতে দেবে?

হাদী হোসেন বললেন, আজমল ভাই এখানে থাকুক। তুমি আমার সঙ্গে ভেতরে আস।

জাহিদ সায় দিয়ে হাদী হোসেনকে অনুসরণ করল। জাহিদ বুঝতে পারছে না, এক সঙ্গে অনেকগুলো প্রেশারের ওষুধ খেয়ে ফেললে বাঁচার জন্য কতটুকু হুমকিস্বরূপ।

আইসিইউতে ঢুকে হাদী হোসেন কিছুতেই তার কান্না থামাতে পারছেন না। যদিও তিনি শব্দ করে কাঁদছেন না।কিন্তু কান্নাটা যেন তার ভেতর থেকে ঠেলে ঠেলে উথলে উঠছে। সজল চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। লাকি ভাবির শরীরে পানিশূন্যতাও দেখা দিয়েছে। নার্স সেলাইন ঝুলিয়ে পানিশূন্যতা দূর করার চেষ্টা করছে।

এরই মধ্যে লাকি ভাবি হাদী হোসেনের হাত টেনে বিড়বিড় করে বললেন, হাদী, আই লাভ ইউ।আই লাভ ইউ সো মাচ।আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু ডাই। প্লিজ হাদী, প্লিজ, আমি বাঁচতে চাই…!

হাদী হোসেন এবার হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন।

ডাক্তার জাহিদকে বললেন, প্লিজ, আপনি ওনাকে বাইরে নিয়ে যান।

।। ছয় ।।

বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। নিউজিল্যান্ডের বৃষ্টি এমনই। একবার শুরু হলে অনবরত সাতদিন বৃষ্টি ঝরবে, কিন্তু বৃষ্টিটা ঝিরিঝিরি করেই ঝরবে। বাইরের বৃষ্টির কারণেই হয়তো কাচের জানালায় কুয়াসার জল জমে সরু রেখা করে গড়িয়ে পড়ছে।

জাহিদ হাদী হোসেনের দিকে তাকাল। তিনি কেমন স্তব্ধ-মূক হয়ে বসে আছেন। এখন আর তিনি কাঁদছেন না। সজল পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তার ভেতরও স্তব্ধতা। আজমল হোসেন বাইরের দিকে হা করে তাকিয়ে আছেন।

লাকি ভাবিপুরো আট ঘণ্টা আইসিইউতে থেকে কিছুক্ষণ আগে মারা গেছেন। মারা যাওয়ার আগে তিনি কোমায় চলে গিয়েছিলেন। ভেন্টিলেটার দিয়ে তাকে ঘণ্টাখানেক বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল।

।। সমাপ্ত ।।