বুধবার, ১৬ই জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে সুন্দরবন, রক্ষা করা একান্ত জরুরী

News Sundarban.com :
জুন ৮, ২০২১
news-image

ভাষ্কর দাশ

—অবলুপ্তির পথে পা বাড়িয়ে দিয়েছে আন্তর্জাতিক খ্যাত বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বাদাবন সুন্দরবন!এমনই এক বিশাল আশাঙ্কাজনক চিন্তা ভাবিয়ে তুলেছে সমগ্র বিশ্বের তাবড় তাবড় বিঞ্জানী এবং পরিবেশবিদদের।

রাষ্ট্রপু্জের একটি সমীক্ষা রিপোর্ট বলছে বিশ্ব উষ্ণায়ণের ফলে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে সাগরে তলিয়ে যাবে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বাদাবন অরণ্য রয়্যাল বেঙ্গলের বাসভূমি সুন্দরবনের ১৫ শতাংশ। ইদানিং গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রভাব বাড়ছে । ফলে পৃথিবী উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। পৃথিবীর ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা সুজলা সুফলা বসুন্ধরার শ্যামলিমায় আগ্রাসী থাবা বসিয়েছে।সমগ্র বিশ্বব্যাপী অর্থ লালসা ও অতৃপ্ত আর্থিক বাসনা পূরণের প্রকৃতিকে সংহার করার অশুভ প্রয়াসের ভয়াবহ পরিণাম আমরা প্রতিদিনই ঢের পাচ্ছি। গ্লোবাল ওর্য়ামিং আমাদের কে ভাবিয়ে তুলেছে।

সেই পরিস্থিতির চরম বিপর্যয়ের হাত থেকে সুন্দরবন কে বাঁচাতে হলে বৃক্ষ রোপণ এবং প্লাসটিক থার্মোকল ব্যবহার বন্ধ করা অত্যন্ত জরুরী।জরুরী যত্রতত্র বৃক্ষ নিধন ব্যাপার টিও।
পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ বাদাবন ম্যানগ্রোভ অরণ্য সুন্দরবন। শুধুমাত্র বাংলাতে নয় সমগ্র দেশ তথা বিশ্বের এক অন্যতম আলোচ্য বিষয়।
১৯৮৪ সালের ৪ ঠা মে জাতীয় অভয়ারণ্য হিসাবে স্বীকৃতি পাওয়া বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ সুন্দরবন বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে বিলীন হয়ে যেতে পারে।এমনই ধারণা বিশ্বের তাবড় তাবড় বিঞ্জানী ও গবেষকদের।পাশাপাশি তাঁদের ধারণ সুন্দরবনে বসবাসকারী প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ সুন্দরবন বাসীর জীবন যে কোন সময়  বিপন্ন হতে পারে।
বর্তমানে এমন কঠিন এবং ভয়ঙ্কর বাস্তব সমস্যার সম্মূখীন সুন্দরবন বাসী।

পরিবেশ কে বাঁচিয়ে রেখে সুন্দরবন কে রক্ষা করা এক বিরাট চ্যালেঞ্জ বা লক্ষ্য।
সহস্র শতাব্দীর এই সুন্দরবনের বাসিন্দাদের করুণ বেদনা যন্ত্রণা নিত্য সঙ্গীসাথী।
সমস্যা আর সমস্যায় জর্জরিত এই পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ সুন্দরবন।

বিশ্ব উষ্ণায়নের কবলে পড়ে সুন্দরবনের ১৯ টি ব্লক ধীরে ধীরে নোনা জলে নিমজ্জিত হতে চলেছে। এমনই রহস্য জনক ঘটনাই ভাবিয়ে তুলেছে সমগ্র সুন্দরবনের সমগ্র প্রাণী কুলকে ও।
আনুমানিক ১৭৭০ সালে সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকার জঙ্গল কেটে জনবসতি গড়ে তোলার পাশাপাশি চাষ-আবাদ শুরু করেছিলেন বাদাবনের বাসিন্দারা। যদিও জনবসতি গড়ে তোলার কয়েক বছর পর জলোচ্ছ্বাসে এবং প্রবল ভূমিকম্পে সুন্দরবনের বিভিন্ন ব্লকের মানুষ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছিল বলে জানা যায়। তারপর ১৮২৮ সালে ব্রিটিশ ইষ্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি সুন্দরবনের বনাঞ্চল ও সম্পত্তি কে সরকারের নিজস্ব বলে ঘোষনা করেন। এরপর সাধারণ বাঁধ দিয়ে ছোট ছোট দ্বীপগুলিকে নিজেদের ইচ্ছেমতো ব্যবহার করতে থাকেন তাঁরা।বৈঞ্জানিক পদ্ধতিতে বাঁধ তৈরী হয়নি।
ফলে ২০০৯ সালের ২৫ মে সোমবার বিধ্বংসী “আয়লা” র পর সুন্দরবনের নদীবাঁধের অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক।ফলে সেই সময় সমগ্র সুন্দরবনে ৩৫০০ কিলোমিটার নদী বাঁধের মধ্যে ৭৭৮ কিলোমিটার নদীবাঁধ প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়।তারপর থেকেই অনবরত সুন্দরবনের বাদাবন ধ্বংস হওয়ায় ভূমিক্ষয়,জলোচ্ছ্বাসও বাড়ছে।সুন্দরবনের অরণ্য ও নদী-নালা সহ বর্তমান মোট আয়তন ৯৬২৯.৯ বর্গ কিলোমিটার । অন্যান্য মিলিয়ে ৫৩৬৩.৪ বর্গ কিলোমিটার,আবার এর মধ্যে ৭,৮৭,৫০০ একর(২৩,৬২,৫০০ বিঘা) জমি কৃষিকাজের। আর সুন্দরবনের বনাঞ্চল ও সংরক্ষিত এলাকার পরিমাণ ৪২৬৪ বর্গ কিলোমিটার ।জল-জঙ্গল নদী-নালা বেষ্টিত সুন্দরবনে প্রায় ৪০০ প্রজাতির গাছ ও অগাছা,অসংখ্য প্রজাতির

মাছ,কাঁকড়া,পাখি,সাপ,জীবজন্তু দেখতে পাওয়া যায়।সুন্দরবনের মোট ১০২ দ্বীপের মধ্যে ৫৪ টি ধ্বংস হয়ে গেছে। আছে মাত্র ৪৮ টি। আবার এর মধ্যে ঘোড়ামারা দ্বীপ দিকে দিকে অবলুপ্তির পথে এগিয়ে চলেছে।

১৮৭২ সালে সুন্দরবনে প্রথম জনগনণা শুরু হয়।সেই সময় জনসংখ্যা ছিল ২,৯৬,০৪৫ জন। আর বর্তমানে জনসংখ্যার বিষ্ফোরণে জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০ লক্ষ। মোট ১৯ টি ব্লক নিয়ে সুন্দরবন। দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার ১৩ টি ব্লক আর উত্তর ২৪ পরগণা জেলার ৬ টি ব্লক নিয়ে গঠিত এই বৃহত্তম ব-দ্বীপ সুন্দরবন(ভারত)। গত ২০০৯ সালের বিধ্বংসী “আয়লা” ঝড়ে প্রচুর কৃষি জমি নষ্ট হয়ে গেছে।তারপর সাম্প্রতিক ইয়াসের প্রচুর চাষযোগ্য জমি নোনা জলের তলায়।ফলে আগামী দিনে সুন্দরবনের মানুষের জীবন জীবিকা নির্বাহ করতে বিশাল সমস্যার সম্মুখিন হতে হবে।

প্রতমত অর্থনৈতিক ভাবে বিপর্যস্ত নদীতে মাছ ধরতে যাওয়া মৎস্যজীবিরা,তারপর লোকালয়ে সুন্দরবনের রাজা দক্ষিণরায়ের(বাঘ) প্রায়ই আনাগোনা,এছাড়া ও বিশ্বের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র সুন্দরবন কে বাঁচানোর দৃঢ় অঙ্গীকার। সুন্দরবনের অধিকাংশ মানুষ দারিদ্র সীমার নীচে বসবাস করেন।বর্তমানে জীবন জীবিকার সন্ধানে অধিকাংশ মহিলা পুরুষ অন্যরাজ্য পাড়ি দিয়ে চলে যাচ্ছেন।আবার জনসংখ্যা ও কালক্রমে দ্রুত হারেই বেড়ে চলেছে। সমগ্র সুন্দরবনের জমি এক ফসলি চাষের জন্য প্রকৃতির উপর নির্ভর করা ছাড়া কোন উপায় নেই!গভীর নলকূপ বসানো কোথাও সম্ভব নয়। সবই লবণাক্ত জল যা কিনা চাষের পক্ষে ক্ষতিকর!যার জন্য বৃষ্টির উপর নির্ভর করতেই হয়। সুন্দরবনে মানুষের জীবন জীবিকা নির্বাহের জন্য ছোট বড় মাঝারি শিল্প প্রয়োজন।

বর্তমানে সুন্দরবন উন্নয়ণ পর্ষদের সৌজন্যে আজ সুন্দরবনের বিভিন্ন দ্বীপের মধ্যে সংযোগ ঘটেছে সেতুর মাধ্যমে,জ্বলছে বিদ্যুতের আলো।
বর্তমানে বিশিষ্ট পরিবেশবিদ এবং বিঞ্জানীদের দাবী পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যত সুন্দরবনের হাতে!তাই একথা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে আমাদের (সুন্দরবনের বাসিন্দাদের) কোন কিছু প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মূখীন হতে হলে পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য কোন জেলা রক্ষা পাবে না।

অন্যদিকে আবার বিশিষ্ট গবেষক বিঞ্জানীদের ধারণা সুন্দরবনের উপর ‘ওয়ার্ড’ , ‘লায়লা’ ,  ‘বান্দু’ কিংবা ‘ফিয়ান’ ফণি,বুলবুল,আম্ফান,ইয়াস এর পর আবারও বড় ধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং জলোচ্ছ্বাস ঘটতে পারে যে কোন মুহূর্তে।
ফলে আগামী দিনে সুন্দরবন কে ভয়াবহ অবস্থার হাত থেকে বাঁচানো যায় তার জন্য অগ্রণী ভূমিকা নিয়ে সুন্দরবনের বাসিন্দা এবং দেশের রাজনৈতিক,সমাজকর্মী,গবেষক এবং বিঞ্জানীদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন।আওয়াজ তুলতে হবে সমগ্র সুন্দরবনের নদীবাঁধ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পাকাপোক্ত কংক্রীটের তৈরী করতে হবে। পাশাপাশি সমগ্র সুন্দরবনের অলিতে গলিতে বৃক্ষ রোপণ করা জরুরী।নচেৎ অদূর ভবিষ্যতে বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপ তথা আর্ন্তজাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র সুন্দরবনের ধ্বংস অবশ্যম্ভাবী।বিশ্ব মানচিত্র হতে লুপ্ত হয়ে সলিল সমাধি ঘটবে!পৃথিবীর নব-প্রজন্মের কাছে শুধুই পড়ে থাকবে সুন্দরবন নামক ইতিহাসের একটি মাত্র ছেঁড়া পৃষ্ঠা মাত্র!

আরও দেখুন