সোমবার, ২২শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপট, রাজনীতির রঙ্গমঞ্চ হার মানায় সিনেমার চিত্রনাট্যকেও

News Sundarban.com :
জানুয়ারি ১, ২০২০
news-image

রাজনীতির রঙ্গমঞ্চ হার মানায় সিনেমার চিত্রনাট্যকেও। আর এই প্রবাদ যেন অক্ষরে অক্ষরে মিলে যায় পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটের সঙ্গে। যে পশ্চিমবঙ্গে একসময় আতস কাচ দিয়ে খুঁজতে হত বিজেপিকে, এখন সেখানে তৈরি হয়েছে বুথভিত্তিক কমিটি। ২০১৯-এ বঙ্গে বহরে বেড়েছে বিজেপি। কিন্তু বছরের প্রথমে ছবিটা কিন্তু এমন ছিল না…

উনিশের ১৯ জানুয়ারি। তৃণমূল নেত্রী ডাক দিলেন ব্রিগেডের। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) ডাকে ইউনাইটেড ইন্ডিয়া Rally শীর্ষক সেই ব্রিগেড মঞ্চে একত্রিত হল গোটা দেশের বিরোধী নেতৃত্ব। মমতার পাশে মঞ্চে সেদিন উপস্থিত ছিলেন শরদ পাওয়ার, স্ট্যালিন, চন্দ্রবাবু নাইডু প্রমুখ। তৃণমূল নেত্রীর বিজেপি বিরোধী ‘অখণ্ড ভারত’ গড়ার ডাকে সাড়া দিয়ে ইউনাইটেড ইন্ডিয়ার সেই ব্রিগেড মঞ্চে বার্তা পাঠিয়েছিলেন সোনিয়া গান্ধীও। লোকসভা নির্বাচনের ৩ মাস আগে অনুষ্ঠিত সেই ব্রিগেড সমাবেশের পর মনে করা হয় জাতীয় রাজনীতিতে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চলেছে তৃণমূল কংগ্রেস। আর অবিজেপি জোটের মুখ হয়ে উঠলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়!

কিন্তু, হিসেব-নিকেশ যতই হোক, লোকসভা নির্বাচনের ফল বেরতেই দেখা যায় সব সমীকরণই ফেল করে গিয়েছে। মোদি ম্যাজিকে ভর বিরোধীদের হারিয়ে একাই ৩০০-র গণ্ডি পার করেছে বিজেপি। এই গেরুয়া ঝড় যে শুধু জাতীয় রাজনীতিতে উঠেছিল তা নয়, ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে গেরুয়া ঝড়ে টালমাতাল হয়ে পড়ে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের তরীও। ভোটের আগে তৃণমূল শিবির স্লোগান তুলেছিল ৪২-এ ৪২। দলের অন্দরের খবর, ৪২টা না হলেও ৩৪টি আসন জিতবে বলে আত্মবিশ্বাসী ছিল ঘাসফুল শিবির। কিন্তু ফল বেরতেই দেখা যায় পদ্মঝড়ে কাৎ সব।  সব অঙ্ক পাল্টে বঙ্গে ১৮টি আসন ছিনিয়ে নেয় বিজেপি (BJP)। ক্ষমতায় আসার পর থেকে যে উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলে বার বার ছুটে গিয়েছেন তৃণমূল (TMC) নেত্রী, সেখান থেকেই খালি হাতে ফিরতে হয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। বিজেপি ঝড়ে তৃণমূলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ‘অশনিসংকেত’ দেখতে পান রাজনীতিবিদরা।

ভোটের ফল বেরনোর একদিন পরই তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেন, তিনি দলকে বেশি সময় দেবেন। এমনকি দরকারে মুখ্যমন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেওয়ার কথাও বলেন তিনি। বলেন, “অনেক কাজ করেছি মানুষের জন্য। এবার দলের জন্য কাজ করব।” নেত্রীর কড়া নজরে শুরু হয় দলের হার নিয়ে চুলচেরা পোস্টমর্টেম। আর সেই ময়নাতদন্তের রিপোর্টেই উঠে আসে তৃণমূলের হারের বেশকিছু কারণ। যারমধ্যে দলের অন্তর্কলহ, আদিবাসী ভোট দূরে চলে যাওয়া, বিভেদমুলক রাজনীতি ও সর্বোপরি কাটমানি উল্লেখযোগ্য। দলীয় বৈঠকে কাটমানি নেওয়ার কথা সরাসরি বলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূল নেত্রীর কাটমানি ফিরিয়ে দেওয়ার বার্তা আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে। একইসঙ্গে ভোটের ফল বেরনোর পর থেকেই হাতছাড়া হতে থাকে একের পর এক পুরসভা। সবমিলিয়ে আরও খানিকটা ‘কোণঠাসা’ হয়ে পড়ে তৃণমূল।

একদিকে লোকসভায় প্রায় ৪০ শতাংশের কাছাকাছি ভোট পেয়ে আত্মবিশ্বাসে টগবগে করে ফুটতে থাকা বিজেপি রামকে হাতিয়ার করে পথে নামে, অন্যদিকে তৃণমূলের সামনে তখন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই। শুরু হয় ঘুরে দাঁড়ানোর মরিয়া চেষ্টা। এই পরিস্থিতিতেই নির্বাচন রণনীতি গুরু প্রশান্ত কিশোরের সঙ্গে হাত মেলান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পিকে-র পরামর্শে ২৯ জুন থেকে শুরু হয় ‘দিদিকে বলো’ (Didi Ke Bolo) কর্মসূচি। প্রথমে বিধায়ক, তারপর ব্লকস্তরের নেতাদের জন্য হোমটাস্ক বেঁধে দেন দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দলকে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে প্রতি শুক্রবার তৃণমূল ভবনে বৈঠক শুরু হয়। দলের অন্দরমহলে বেশকিছু রদবদল ঘটান নেত্রী। দেন নতুন গাইডলাইন।

এখন পিকে-র পরামর্শ নিয়ে একদিকে তৃণমূল যখন হারানো জনসংযোগ ফিরে পেতে চাইছে, অন্যদিকে লোকসভা ভোটে ছক্কা হাঁকিয়ে বিজেপি বঙ্গে আরও সংগঠন বিস্তারের চেষ্টা করে চলেছে, ঠিক তখনই অগস্ট মাসে অসমে প্রকাশিত হয় নাগরিকপঞ্জির চূড়ান্ত তালিকা। ব্যস, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে চলে আসে নতুন হাতিয়ার। একদিকে ‘দিদিকে বলো’ দিয়ে ড্যামেজ কন্ট্রোলের চেষ্টা, অন্যদিকে এনআরসিকে হাতিয়ার করে রাজ্যের উত্তর থেকে দক্ষিণ চষে ফেললেন তৃণমূল নেত্রী। এনআরসি ইস্যুতে প্রথম পরীক্ষা হল খড়গপুর, কালিয়াগঞ্জ, করিমপুর- এই ৩ কেন্দ্রের উপনির্বাচন। যাতে ফুলমার্কস নিয়ে পাস করল তৃণমূল কংগ্রেস। দলে আরও নম্বর বাড়ল শুভেন্দু অধিকারী, রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায় ও মহুয়া মৈত্রের। আর উপনির্বাচনের ফলের পরই এনআরসি-কে হাতিয়ার করেই তৃণমূল যে আগামী লড়াইগুলি লড়বে, তা স্পষ্ট করে দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আরও চড়ালেন বিরোধিতার সুর।

ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টাতে থাকল। বছরের শেষে এসে সংসদে পাস হল নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল। যার চরম বিরোধিতা করল তৃণমূল কংগ্রেস। সিএবি-র (CAA) বিরোধিতায় সংসদে জ্বালাময়ী ভাষণ দিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। যদিও ভোটাভুটিতে পাসের পর রাষ্ট্রপতির সইয়ে সেই বিল পরিণত হল আইনে। কিন্তু সেই আইনকে ফেরত নেওয়ার জন্য ফের পথে নেমে লাগাতার আন্দোলনের ডাক দিলেন তৃণমূল নেত্রী। সিএএ-র বিরোধিতায় রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ল অশান্তি, বিক্ষিপ্ত হিংসা। এই অবস্থায় নিজে রাস্তায় নেমে একদিকে যেমন পরিস্থিতির মোকাবিলা করলেন, তেমনই পদযাত্রার পর পদযাত্রা করে আন্দোলনের ধার বাড়ালেন মমতা।

আন্দোলনকে শুধু রাজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা নয়, সর্বভাবরতীয় স্তরে ঐক্যবদ্ধ বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য ফের ডাক দিলেন তৃণমূল নেত্রী। এনআরসি (NRC), সিএএ (Citizenship Amendment Act 2019) বিরোধিতায় চিঠি লিখলেন শরহ পাওয়ারকে। কথা বললেন সোনিয়ার সঙ্গেও। এর ঠিক এরপরই তাৎপর্যপূর্ণভাবে ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে হেমন্ত সোরেনের শপথগ্রহণ মঞ্চ যেন ফের দেখা দিল ‘ইউনাইটেড ইন্ডিয়া’ মঞ্চ হিসেবে। দেখা গেল, বিজেপির শরিক যারা নাগরকিত্ব আইনের পক্ষে ভোট দিয়েছিল, তাঁরাও যেন এখন খানিকটা বেসুরো। তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুরে সুর মিলিয়েই তারা যেন এনআরসি-সিএএ বিরোধিতায় পা বাড়িয়েছে।

তবে উপনির্বাচনের ফল যাই-ই বলুক, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরোধিতায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যতই সুর চড়াক, পরিসংখ্যান বলছে বঙ্গে ব্যাপকভাবে বহরে বেড়েছে বিজেপি। একদিকে লোকসভা ভোটে একধাক্কায় ২টো আসন থেকে ১৮ আসন প্রাপ্তি, অন্যদিকে সংগঠনের বিস্তার। মাটি কামড়ে পড়ে থেকে বুথভিত্তিক কমিটি তৈরি করেছে বিজেপি। প্রায় ৮০ শতাংশ বুথে ইতিমধ্যেই কমিটি গঠন সম্পূর্ণ হয়ে গিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে সংগঠনের অগ্রগতির বিচারে ২০১৯ রাজ্য বিজেপির কাছে যে বড় পাওনা, তা বলাই বাহুল্য। এখন লক্ষ্য একটাই একুশে বিধানসভা দখল। তারজন্য তৈরি হচ্ছে রণনীতি। লোকসভা ভোটের আগে প্রথমবার বড় করে ব্রিগেড সমাবেশ করেছিল বিজেপি। দলের অন্দরের খবর, একুশের আগে এরকম ব্রিগেড সমাবেশ বিজেপি আরও করবে। পশ্চিমবঙ্গে খুঁটি পোঁতার কাজ সম্পূর্ণ, এখন তৃণমূলের সঙ্গে বিজেপির ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে বুঝে নেওয়ার লড়াই। আর তাতে কোনও খামতি রাখতে নারাজ গেরুয়া শিবির।

যদিও এতকিছুর পরেও একটা খামতি এখনও মিটিয়ে উঠতে পারেনি পদ্মশিবির। বিধানসভা দখলের লড়াইয়ে এরাজ্যে মুখ কে? এখনও পর্যন্ত তা নির্দিষ্ট করে উঠতে পারেনি বিজেপি। দিলীপ ঘোষ? তৃণমূল থেকে বিজেপিতে আসা সব্যসাচী দত্ত, শোভন চট্টোপাধ্যায়ের মতো হেভিওয়েট নেতা? নাকি অন্য কেউ? উত্তর নেই এখনও। শোভন চট্টোপাধ্যায় যেদিন বিজেপিতে যোগদান করেছিলেন, সেদিন দিলীপ ঘোষ বলেছিলেন, “দলের ভবিষ্যতের জন্য খুব ভালো হল।” কিন্তু বিজেপিতে যোগদানের কিছুদিনের মধ্যেই গেরুয়া শিবিরের সঙ্গে ‘মধুচন্দ্রিমা পর্ব’ সম্পন্ন হয় শোভনের। রাজ্য বিজেপির লাইমলাইট থেকে অনেকটাই অন্ধকারে চলে যান শোভন। ইতিমধ্যে ভাইফোঁটায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাড়িতে গিয়ে তৃণমূল নেত্রীর কাছ থেকে ফোঁটাও নিয়ে আসেন তিনি। যাতে আরওই উসকে ওঠে ‘ঘর বাপসি’র জল্পনা। সবমিলিয়ে একুশের বিধানসভা নির্বাচনের আগে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে টেক্কা দিয়ে বঙ্গ বিজেপির ‘মুখ’ খুঁজে বের করাই গেরুয়া শিবিরের কাছে এখন বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২০ সালে আমজনতা থেকে রাজনৈতিক মহলের নজর থাকবে সেদিকেই…