বৃহস্পতিবার, ১৬ই মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

কিংবদন্তী শিল্পী আব্বাস উদ্দিন অাহম্মদ এর ৫৮ তম প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধার্ঘ

News Sundarban.com :
ডিসেম্বর ২৯, ২০১৭
news-image

  সুভাষ চন্দ্র দাশ
আব্বাস উদ্দিন আহম্মদ বাংলার লোকসংগীত জগতের এক প্রবাদপ্রতিম উজ্জল নক্ষত্র।১৯০১ সালে ২৭ অক্টোবর কোচবিহার জেলার তুফানগঞ্জের বলরাম পুর গ্রামে জন্ম। মায়ের নাম হিরামন নেসা। পিতা মহম্মদ জাফর আলি কোচবিহার জেলার একজন স্বনামধন্য আইনজীবি ও জমিদার ছিলেন। আব্বাস উদ্দিন ছোটবেলা থেকেই তীক্ষ্ন বুদ্ধি ও মেধাবী ছিলেন। লেখাপড়ায় ও ছিলেন মেধাবী ছাত্র। তিনি শিক্ষকদের কাছে বড় প্রিয় আদরের ছাত্র ছিলেন। প্রথম শিশু অবস্থায় একজন জনপ্রিয় শিল্পী ছিলেন কিন্তু দুর্ভাগ্য কারোর কাছে গান শেখার তালিম পাননি। তিনি শিখেছিলেন গ্রাম্য গায়ক,ক্ষেত মজুর কৃষকের মুখের গান শুনে শুনে। একসময় তাঁকে ভাওয়াইয়া শিখতে বিশেষ ভাবে অনুরোধ করেছিল তাঁরই গ্রামেরই শিল্পী পাগারম্নও নায়েব আলি টেপুর। স্কুলে যাওয়া কিংবা আসার পথে গলা ছেড়ে তিনি ভাওয়াইয়া গান গাইতে গাইতে পথ চলতেন।
কোচবিহারের বলরামপুর স্কুলে পড়াকালীন পঞ্চমশ্রেণী পর্যন্ত প্রথম স্থান ছিল তাঁর দখলে।
কলকাতায় বিশের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু হয় সংগ্রামী এক বর্ণময় শিল্পী জীবন। তৎকালীন বাংলাদেশের মুসলমানদের হৃদয়ে পৌঁছানোর দুটি মাত্র পথ খোলা ছিল। একটি তাদের মনেরকথা লোকগীত,অপরটি তাদের প্রাণের কথা ইসলামী গান।
১৯৪৭ সালে ১৪ অাগষ্টের পর তিনি তৎকালীন রেডিও পাকিস্থানে গান গাওয়া শুরু করেছিলেন। চাকরি নিয়েছিলেন পাবলিসিটি ডিপার্টমেন্টে। সেই সময় কোচবিহারের একটি অনুষ্টানে আব্বাস উদ্দিন আহমেদের গান শুনে কবি নজরুল ইসলাম আনন্দিত হয়ে শিল্পীকে কলকাতায় আসার জন্য আমন্ত্রণ করেছিলেন।
আব্বাস উদ্দিন আহমেদ মাত্র ২৩ বছর বয়সে কলকাতায় গ্রামোফোন কোম্পানি তে দুটি গান রেকর্ডিং করেছিলেন বিমল দাশগুপ্তের সহযোগিতায়।“কোন বিরহির নয়নজলে বাদল ঝরে গো” অপরটি “স্মরণ পারে ওগো প্রিয়” গানদুটি সেই সময়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এরপরই শিল্পী কলকাতার বুকে স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করেন। এই সময় কবি নজরুলের গভীর সান্নিধ্যে আসেন আব্বাস উদ্দিন আহমেদ। পরে কবি নজরুলের একান্ত সহযোগিতায় একাধিক ভাওয়াইয়া গানের রেকর্ড হয়েছিল। কবি নজরুলের লেখা ও সুরে এবং আব্বাস উদ্দিনের দরদী কন্ঠে গান গুলি যথেষ্ট জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।
আব্বাস উদ্দিনের আধুনিক গানের সংখ্যা অজস্র। আবার তিনি পল্লীগীতি ৫৮,ইসলামী গান ৮৪,ভাওয়াইয়া ৩৭,কাব্যগীতি ৩১টি গেয়েছেন। এমনকি যে তিনি সেই সময়ে ইসলামী গানকে কন্ঠে ধারণ করেছিলেন বলেই তৎকালীন মুসলীম সমাজের রেনেসার উৎপত্তি হয়েছিল। এক সময় যে গান কে হারাম বলে কানে আঙুল দিতেন মুসলমানরা। পরে তারাই আব্বাস উদ্দিনের দরদী কন্ঠের গান শুনে বিষ্ময় হয়েছিলেন “মন রমজানের ওই রোজার শেষে এল খুশির ঈদ” “ত্রিভুবনের প্রিয় মহম্মদ এলোরে দুনিয়ায়” ইসলামী গান শুনে। পরবর্তীকালে কবি নজরুলের লেখা ও সুরকরা রোজা,নামাজ,হজ যাকাত,ঈদ,শবেরাত ফাতেহা,ইসলামী গজল সহ একাধিক গানে কন্ঠ দিয়েছিলেন। তিনি অসংখ্য পল্লীগীতি,মুর্শিদীজারী,সারি,ভাটিয়ালী,হামদ্, নাত, ও পালাগান গেয়েছেন। গায়কের পাশাপাশি আব্বাস উদ্দিন আহমেদ অভিনয় ও করেছিলেন। তিনি “বিষ্ঞু প্রিয়া” “মহানিশা” “একটি কথা ও ঠিকাদার” ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। তিনি শিকাগো,লন্ডন,নিউইয়ার্ক,প্যারিস,জাপান,অষ্ট্রেলিয়া সহ পৃথিবীর বহু দেশে পল্লীগীতি,ভাওয়াইয়া গান গেয়েছেন। ১৯৫৫ সালে ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলিয়ায় দক্ষিণ এশিয়া সঙ্গীত সম্মেলনে ও ১৯৫৬ সালে জার্মানী তে আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীত সম্মেলন সহ আরো অন্যান্য অনেক আন্তর্জাতিক সঙ্গীত সম্মেলনে অংশ গ্রহন করেছিলেন। পল্লীগীতি,ভাওয়াইয়া, গানের জনক আব্বাস উদ্দিন আহমেদ দীর্ঘদিন ধরে দুরারোগ্য রোগে ভুগেছিলেন। অবশেষে ১৯৫৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর সকাল ৭-৩০ এ বাংলাদেশের ঢাকায় ভাওয়াইয়া ও পল্লীগীতির জনকের জীবনাবসান হয়।
আজ মহান শিল্পীর ৫৮ তম মহান প্রয়াণ দিবসে রইলো শ্রদ্ধার্ঘ। ।