মঙ্গলবার, ২৮শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

মুসলিম দেশে ফিরিয়ে আনার কথা রাখবে সৌদি আরব?

News Sundarban.com :
অক্টোবর ২৯, ২০১৭
news-image

সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান দেশটিকে উদারপন্থী মুসলিম দেশে ফিরিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছেন। গত মঙ্গলবার দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের সামনে তিনি যখন ঘোষণাটি দিচ্ছিলেন, তখন কিছুটা হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন সবাই। মুহূর্তেই সামলে উঠে সবাই করতালি দিয়ে এ ঘোষণাকে স্বাগত জানালেও কতজন এতে আস্থা রাখছেন, সেই প্রশ্নটিই উঠছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, উদারপন্থী ইসলামে ফিরে যাওয়ার ঘোষণা সৌদি আরবের বাজার পরিকল্পনার একটি অংশ। তাঁদের মতে, শুধু ঘোষণা দিয়েই চরমপন্থা থেকে হুট করে বের হয়ে আসতে পারবে না দেশটি। এমন পদক্ষেপে সৌদি আরবে উল্টো অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।

রাজধানী রিয়াদে আয়োজিত তিন দিনের অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলনে প্রায় দুই হাজার বিদেশি বিনিয়োগকারী উপস্থিত ছিলেন। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে ৩২ বছর বয়সী যুবরাজ আরও বলেন, ‘আমরা একটি স্বাভাবিক জীবন চাই। এমন একটি জীবন চাই যেখানে ধর্মের ভাষান্তর হবে সহনশীলতা ও আমাদের দয়ার ঐতিহ্য। সৌদি জনগণের ৭০ শতাংশের বয়স ৩০ বছরের নিচে এবং কোনো উগ্রবাদী আদর্শের সঙ্গে যুঝতে যুঝতে আমরা জীবনের বাকি ৩০টি বছর নষ্ট করতে পারি না। আমরা উগ্রপন্থাকে আজ, এখনই ধ্বংস করব। খুব শিগগিরই আমরা উগ্রপন্থার অবসান ঘটাব।’

বিশ্লেষকেরা বলছেন, মোহাম্মদ বিন সালমান মূলত সৌদি আরবের তরুণ সম্প্রদায়ের কাছে জনপ্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন। এই তরুণ সম্প্রদায় ধর্মীয় দিক থেকে বয়স্কদের মতো গোড়া নয় এবং বর্তমান উচ্চ বেকারত্ব হারের মূল ভুক্তভোগী তাঁরা।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা সেন্টার ফর গ্লোবাল পলিসির জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক কামরান বোখারি ব্লুমবার্গকে বলেন, ‘বিষয়টি এমন নয় যে আপনি স্রেফ পুরোনো চিন্তা-ভাবনা ছুড়ে ফেলে দিয়ে নতুন ভাবনায় চলে এলেন। এতে ঝুঁকি আছে। এটি অনেকটা চলন্ত অবস্থায় এক ট্রেন থেকে আরেক ট্রেনে লাফ দেওয়ার মতো ঘটনা। মনে রাখতে হবে, সৌদি আরবের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ধর্মীয় প্রাতিষ্ঠানিকতার ওপর নির্ভরশীল।’

এত দিন সৌদি আরবের অর্থনীতি তেল দিয়ে চলেছে। ধারাবাহিকভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে যাওয়ায় এখন পর্যটন, প্রযুক্তি, বাণিজ্যসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে হাত বাড়াতে চাইছে দেশটি। অর্থাৎ অর্থনৈতিক সংস্কার আনতে চাইছেন মোহাম্মদ বিন সালমান। হাজার হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকার মরুভূমিকে নতুন শহরে পরিণত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মূলত তেলভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে রূপান্তর, নতুন চাকরির ক্ষেত্র তৈরি ও বিনিয়োগ বাড়াতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের জ্যেষ্ঠ ফেলো রামি খৌরি বলেন, সৌদি যুবরাজের এ প্রচেষ্টার মূল কারণ হলো পশ্চিমা বিশ্বকে আকর্ষণ করা। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতার এই অধ্যাপক বলেন, ‘পশ্চিমা বিশ্ব যা যা চাইছে, ঠিক তাই নিয়ে হাজির হতে চাইছেন যুবরাজ। এ জন্যই নানা উদ্যোগ, উদারবাদ ও উদারপন্থী ইসলামের কথা বলা হয়েছে। এসব মূলত চটকদার কথা। তিনি সত্যিকারের সৃজনশীল ও আধুনিক ধারণার বদলে ঐতিহ্যবাহী আরব স্বৈরাচারী নেতৃত্বের দুর্বলতার বিষয়টিই মনে করিয়ে দিচ্ছেন।’

নতুন যুবরাজের আমলে আরও বদল এসেছে সৌদি আরবে। তেল সংস্থা সৌদি আরামকোর একটি বড় অংশ বিক্রি করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কিছু সামাজিক ট্যাবু ভাঙার কাজও শুরু হয়ে গেছে। নারীদের গাড়ি চালানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আগামী বছরের জুন থেকে নারীরা রাস্তায় গাড়ি চালাতে পারবেন।

তবে তাই বলে সৌদি আরব যে রাতারাতি চরমপন্থা থেকে উদারবাদী দেশ হয়ে যাচ্ছে—তা কিন্তু নয়। দেশটিতে এখনো নারীরা অনেক ক্ষেত্রেই লিঙ্গবৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। নারীদের ওপর পুরুষদের অভিভাবকত্বের নিয়ম এখনো আছে। অভিযোগ আছে, দেশটিতে প্রকাশ্যে সুন্নি ওয়াহাবি মতবাদের ব্যাপক চর্চা হয়। আবার জঙ্গিগোষ্ঠী আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটও (আইএস) ওয়াহাবি মতবাদে উদ্বুদ্ধ।

লন্ডন স্কুল অব ইকনোমিকসের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক গবেষক মাদওয়াই আল-রশিদ দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেছেন, সৌদি আরবই একমাত্র দেশ নয় যেখানে উদারপন্থী ইসলাম অতিরক্ষণশীল রূপ ধারণ করেছে। কিন্তু এই দেশটি একটি জায়গায় ব্যতিক্রম। সেটি হলো—সৌদি আরবে মৌলবাদী ধর্মীয় বিশ্বাস পর্যায়ক্রমে রাষ্ট্রীয় ধর্মে পরিণত হয়েছে এবং বৈধতা পেয়েছে। এই গবেষক বলেন, ‘যেসব ধর্মীয় নেতারা গণতন্ত্রের সঙ্গে ইসলামের মিল দেখাতে গিয়েছিলেন, সৌদি নেতৃত্ব তাঁদের কারাগারে পাঠিয়েছিল।’

সৌদি যুবরাজ যে ঘোষণা দিয়েছেন, আদৌ তা বাস্তবায়ন করা হবে কি না—তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন মাদওয়াই আল-রশিদ। তিনি বলেন, ‘এসব ঘোষণায় সৌদি আরবে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবেই বিনিয়োগকারীরা আগ্রহী হবেন। এতে করে এই ক্ষেত্রে দেশটির আগে যে দুর্নাম ছিল, তা ঘুচবে।’

জার্মানিভিত্তিক সাংবাদিক নাদের আলসারাস মনে করেন, সৌদি যুবরাজের এ ধরনের সমালোচনা ভিত্তিহীন নয়। সত্যিকারের রূপান্তরের জন্য সৌদি আরবে ভিন্ন কিছু ক্ষেত্রে সংস্কার আনতে হবে। তবে সে বিষয়ে সৌদি শাসকেরা খুব একটা আগ্রহী নন। ডয়চে ভেলেতে প্রকাশিত এক কলামে তিনি লিখেছেন, সৌদি আরবে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতির সংকট থাকলেও, তা নিয়ে শাসকদের মাথাব্যথা নেই। আর বহুদিন ধরে গড়ে ওঠা মানসিকতা পরিবর্তন করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

এমন পরিস্থিতিতে মোহাম্মদ বিন সালমান নিজের দেওয়া প্রতিশ্রুতি কতটুকু রাখতে পারবেন, তা নিয়ে সন্দেহ তাই যাচ্ছে না। সেন্টার ফর গ্লোবাল পলিসির জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক কামরান বোখারি বলেন, ‘আপনি সবাইকে খুশি করতে পারবেন না। আপনি বলতেই পারেন যে, আমি তরুণদের সঙ্গে থাকব, নারীদের সঙ্গে থাকব, আধুনিক মানুষদের সঙ্গে থাকব। কিন্তু এভাবে কাজের কাজ হবে না।’

সৌদি আরবে রক্ষণশীল ধর্মীয় গোষ্ঠী খুব প্রভাবশালী। দেশটির প্রশাসনেও এর যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। আর সামাজিক প্রতিপত্তির কথা না বললেও চলে। যুবরাজের সাম্প্রতিক বক্তব্য এই গোষ্ঠীর জন্য একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এ থেকে নতুন বিরোধ সৃষ্টি হবে, নাকি সত্যিই বদলে যাবে সৌদি আরব-সময়ই দেবে এর উত্তর।