বৃহস্পতিবার, ২২শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

বাংলাদেশে পালিয়ে আসা লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারকে ফেরত নিতেই হবেঃকফি আনান

News Sundarban.com :
অক্টোবর ১৫, ২০১৭
news-image

রাখাইনে চলমান সেনা নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারকে ফেরত নিতেই হবে। কোনো শরণার্থী ক্যাম্পে নয়, তাদের নিজের বাড়িতেই ফিরিয়ে নিতে হবে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের চতুর্থ দফা বৈঠকে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান জোরালো কণ্ঠে এ দাবি জানান। সংকট নিরসনে মিয়ানমারকে কঠোর চাপও দিতে বলেন তিনি। পাশাপাশি জোর দেন, নিজের নেতৃত্বাধীন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের ওপর। তবে মিয়ানমার সরকার গঠিত তদন্ত কমিশনপ্রধান কফি আনানের জোর আহ্বান সত্ত্বেও চীন ও রাশিয়ার বিরোধিতায় দেশটির বিরুদ্ধে কোনো প্রস্তাব আনতে আবারও ব্যর্থ হয়েছে নিরাপত্তা পরিষদ। তবে আশার দিকও রয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদের সব সদস্যই সংকট নিরসনের পক্ষে।

শুক্রবার মধ্যরাতে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ কমিটির এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের উদ্যোগে আয়োজিত অনানুষ্ঠানিক আরিয়া ফর্মুলার এই রুদ্ধদ্বার বৈঠকে জাতিসংঘে নিয়োজিত বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের প্রতিনিধিরাও বক্তব্য রাখেন। সদস্য দেশগুলো ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। এদিকে, জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার রুপার্ট কোলিভন এক সাক্ষাৎকারে প্রয়োজনে শান্তিরক্ষী মোতায়েন করে হলেও রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরত পাঠানোর কথা বলেছেন। তিনি মনে করেন, এটাই সবচেয়ে ভালো সমাধান।

এবারের বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশের প্রতিনিধিরা মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে আনান কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। জাতিসংঘে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত ছাড়াও অফিস অব দ্য হাইকমিশন অব হিউম্যান রাইটস, অফিস ফর দ্য কো-অর্ডিনেশন অব হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাফেয়ার্স, ইউএনএইচসিআর, ওআইসি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরাও বৈঠকে বক্তব্য রাখেন। এবারের বৈঠকে রাখাইনে অবলম্বে সহিংসতা বন্ধ, মানবিক সহায়তার শর্তহীন অবাধ প্রবেশাধিকার এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন- এ তিনটি বিষয়ে একমত হয়েছে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য দেশগুলো। সবাই বাস্তুচ্যুত ও অসহায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে মানবিক সহায়তা দেওয়ায় বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশের জনগণের ভূয়সী প্রশংসা করেন।

বৈঠক শেষে কফি আনান সাংবাদিকদের বলেন, এ কমিশনের সুপারিশ মিয়ানমার সরকার বাস্তবায়ন করবে বলে আশা করি। আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষ মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখবে বলে আমার বিশ্বাস।

রাখাইন সংকট নিয়ে আনান কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশের দিনই সহিংসতার শুরু হয়। এর জবাবে গত ২৫ আগস্ট রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনী সহিংস অভিযান শুরু করে। এ পরিস্থিতিতে প্রাণ বাঁচাতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। ব্যাপক চাপে পড়ে সরকার। সংকট নিরসন ও সহযোগিতার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে বারবার আহ্বান জানিয়ে আসছে সরকার। এর পরিপ্রেক্ষিতে রোহিঙ্গা ইস্যু আন্তর্জাতিক সম্প্র্রদায়ের নজর কাড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য দেশগুলো চতুর্থবারের মতো বৈঠকে বসে। গত ২৮ আগস্ট থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিরাপত্তা পরিষদ মিয়ানমার পরিস্থিতির ওপর তিনবার আলোচনায় বসে। সর্বশেষ বৈঠকে রাখাইন পরিস্থিতি নিয়ে সর্বসম্মতিক্রমে গভীর উদ্বেগ জানানো হয়।

আবারও চীন ও রাশিয়ার বিরোধিতা : নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য দেশগুলোর মধ্যে রাশিয়া ও চীন আবারও মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে থাইল্যান্ডভিত্তিক দ্য নেশন জানিয়েছে, এ বৈঠকেও রোহিঙ্গা ইস্যুতে একটি প্রস্তাব গ্রহণের ব্যাপারে কথা হয়েছে। তবে চীন ও রাশিয়ার বিরোধিতার মুখে সেই পদক্ষেপের ব্যাপারে কোনো ইতিবাচক অগ্রগতি সম্ভব হয়নি। একইভাবে ভারতীয় সংবাদ সংস্থা আইএএনএনও একই কথা জানিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের পক্ষে কথা বলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতিসংঘ প্রতিনিধি রোহিঙ্গা পরিস্থিতিকে মানবিক বিপর্যয় আখ্যা দিয়ে বলেন, যথেষ্ট হয়েছে। আমরা মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর এই হীন কাজের নিন্দা জানাই। তিনিও কফি আনান পরিষদের সুপারিশ পূর্ণ বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন। প্রায় একই ভাষায় কথা বলেন অন্যান্য সদস্য দেশের প্রতিনিধিরা।

মিয়ানমারের ভাষ্য ও বাস্তবতার মধ্যে বিস্তর ফাঁক : রাখাইন পরিস্থিতি নিয়ে মিয়ানমার সরকারের বিবৃতি ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে বিস্তর ফারাক আছে বলে নিরাপত্তা পরিষদকে অবহিত করেন জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি মাসুদ বিন মোমেন। বৈঠকে তিনি বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, মিয়ানমার সরকারের দেওয়া বিবৃতি আর রাখাইন রাজ্যের প্রকৃত পরিস্থিতির মধ্যে বিস্তর ব্যবধান রয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের অফিসেরর্ যাপিড রেসপন্স মিশনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এমনটিই তুলে ধরা হয়েছে। গত ২৫ আগস্টের পর থেকে আজ (শুক্রবার) সকাল পর্যন্ত পাঁচ লাখ ৩৬ হাজার মানুষ মিয়ানমার সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। সব মিলিয়ে উদ্বাস্তুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে নয় লাখে।’ জাতিসংঘে বাংলাদেশ মিশন থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।

গত মাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ভাষণে মিয়ানমার পরিস্থিতি সমাধানে যে পাঁচটি পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেছিলেন, স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেনও নিজের বক্তৃতায় সে বিষয়গুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘সহিংসতা ও একটি জাতিকে নির্মূলের প্রক্রিয়া বন্ধ, মিয়ানমারে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন প্রেরণ, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সেফ জোন তৈরি, জোরপূর্বক উচ্ছেদকৃত মানুষকে নিজ ভূমিতে স্থায়ীভাবে প্রত্যাবাসন এবং কফি আনান কমিশনের সুপারিশের পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে।’

শান্তিরক্ষী মোতায়েন করে হলেও রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে হবে : প্রয়োজনে শান্তিরক্ষী মোতায়েন করে হলেও রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মত দিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার রুপার্ট কোলিভন। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় তুরস্কের বার্তা সংস্থা আনদুলু এজেন্সির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেন, শান্তি প্রতিষ্ঠায় রোহিঙ্গারা শান্তিরক্ষা কার্যক্রম চান। বিশ্ব সম্প্রদায়কে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মাস দুয়েক হতে চলল, সেনা অভিযান চলছেই। তবু জাতিসংঘ সেখানে শান্তিরক্ষী পাঠানোর উদ্যোগ নেয়নি বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

সহায়তা জোরদার করছে জাতিসংঘ : রাখাইন থেকে এখনও স্রোতের মতো রোহিঙ্গা পালিয়ে আসছে। নতুন করে আসা শরণার্থীদের জন্য আরও বেশি ত্রাণ-সহায়তা দরকার বলে মনে করে জাতিসংঘ। গতকাল এক বিবৃতিতে বলা হয়, এ লক্ষ্যে ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করতে চাইছে জাতিসংঘসহ সংস্থাগুলো। খাদ্য, জ্ল, চিকিৎসা ও আশ্রয় নির্মাণ বাবদ আগামী ছয় মাসের জন্য চার কোটি ৮০ লাখ ডলার তহবিল চেয়েছে তারা। খবর এনআরবি নিউজ, ডেইলি স্টার, বিডিনিউজ ও এপির।